স্বরণীয় যারা

১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মার্চের ভাষনের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে তৎকালীন পুলিশ সুপার শহীদ মুন্সী কবির উদ্দীন আহম্মেদ পি পি এম, পি এস পি কুমিল্লা সার্কিট হাউজে অবস্থান নেয়া জেলা প্রশাসক কে এম শামসুল হক খান সি এস পি এর সাথে সংহতি প্রকাশ করে পাকিস্তানী বাহিনীর সম্ভাব্য হামলার প্রতিরোধে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহন করেন।

সে সময়কার ময়নামতি সেনানিবাসের ব্রিগেড কমান্ডার ইকবাল শফি পুলিশ সুপারের কাছে পুলিশ লাইন্স অস্ত্র ভান্ডরের চাবি চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ক্ষিপ্ত সেনা কর্মকর্তা পরদিন তাঁকে সেনানিবাসে ডেকে পাঠালে,তিনি সেখানে যেতেও নির্ভীক চিত্তে অপারগতা প্রকাশ করেন। কারনেই ক্ষিপ্ত পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকাল ৮টায় তাঁর সরকারী বাসভবন থেকে তাঁকে আটক করে সামরিক প্রহরায় সেনানিবাসে টর্চার সেলে নিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নৃশংস পৈশাচিকভাবে নির্যাতনের পর ৩০ মার্চ সেনানিবাসের ৪০ ফিল্ড এ্যম্বুলেন্সের সামনে চোখ বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। উল্লেখ্য,তিনিই দেশের একমাত্র পুলিশ সুপার, যিনি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে শহীদ হয়েছেন।

শহীদ মুন্সি কবির উদ্দিন আহমেদ পিপিএম পিএসপি,  ১৯১৮ সালের ০১ জানুয়ারী সিরাজগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার কাটার বাড়ি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের ১৮ আগষ্ট তিনি কুমিল্লার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন।

 

 

এছাড়াও নিম্নবর্নিত পুলিশ সদস্যগন ১৯৭১ সালে শহীদ হন

১.   জনাব প্রফুল্ল কুমার দে, কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক, কুমিল্লা।

২.   জনাব যগেন্দ্র লাল চাকমা। পি.আই, মুরাদনগর, কুমিল্লা।

৩.   জনাব এ.বি.এম আব্দুল হালিম, আর.আই, কুমিল্লা।

৪.   দারোগা অর্জুন চন্দ্র দে

৫.   সুবেদার রুহুল আমিন

৬.   সুবেদার জোয়াদ আলী খান

৭.   সহকারী দারোগা গঙ্গা রাম দে

৮.   হাবিলদার সুলতান খান

৯.   হাবিলদার মুন্সি মিয়া

১০.  কনষ্টেবল ফজলুল করিম

১১.  কনষ্টেবল প্রতাপ চন্দ্র সিংহ

১২.   কনষ্টেবল গোপেন চন্দ্র দে

১৩.  কনষ্টেবল জহিরুল হক

১৪.   কনষ্টেবল লাল মিয়া

১৫.  কনষ্টেবল জয়নাল আবেদীন

১৬.  কনষ্টেবল সাইদুল হক

১৭.   কনষ্টেবল মীর ইসহাক হোসেন

১৮.  কনষ্টেবল আবদুল হক

১৯.  কনষ্টেবল কুটি চান্দ মিয়া

২০.   কনষ্টেবল আহসান উল্যাহ

২১.   কনষ্টেবল আনছার আলী

২২.   কনষ্টেবল আবদুল খালেক

২৩.  কনষ্টেবল মুজিবুর রহমান

২৪.   কনষ্টেবল মোতাহের আলী

২৫.   কনষ্টেবল পরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী

২৬.  কনষ্টেবল আহসান উল্লাহ

২৭.   কনষ্টেবল খাজা সাইফুর রহমান

২৮.  কনষ্টেবল আবদুস শহীদ

২৯.  কনষ্টেবল মোঃ রফিক

৩০.  কনষ্টেবল রহিম উদ্দিন

 

 

 

২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ পুলিশের

 

 

 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দুপুর ২টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা খবর আসতে থাকে। এরপরই পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে সারা শহরে পুলিশের পেট্রোল টিম পাঠানো হয়। পেট্রোল টিম বেতার মারফতে খবর পাঠাতে থাকে শহরের অবস্থা থমথমে ও আতংকগ্রস্ত। ওই দিন বিকেল ৪টার দিকে মিরপুর, তেজগাঁও শ্রমিক অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে খবর আসতে থাকে অবাঙালী শ্রমিকরা বিভিন্ন স্থানে আক্রমণাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশী সূত্রসহ নানা রাজনৈতিক সূত্র থেকে খবর আসে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আক্রমন চালানো হতে পারে। এই খবরে বাঙালী পুলিশ সদস্যরা বিক্ষিপ্ত ভাবে নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করে নেন। রাত ১০ টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে টহলরত একটি পুলিশ পেট্রোল টিমের বেতার মারফত জানায়, পাক বাহিনীর একটি বড় কনভয় যুদ্ধসাজে শহরের দিকে এগুচ্ছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে পুলিশের পেট্রোল টিম খবর পাঠায় যে, রমনা পার্কের (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সেনাবাহিনীর অন্ততঃ ৭০/৮০টি সাঁজোয়া যান পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। রাত ১১টার দিকে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থানরত পুলিশের পেট্রোল টিমের সদস্যগণ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানের বহরকে ঐ এলাকা অতিক্রম করতে দেখে। পুলিশের টহল টিম পেট্রোল গাড়িটি নিয়ে অন্যপথে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পৌছে এই খবর  দেন। রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা যে যার মত প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

রাত সোয়া ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানসমূহ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের চারিদিকে অবস্থান নিতে থাকে। তখন পাক বাহিনীর এই আক্রমনের খবর তাৎক্ষণিক ভাবে সারা দেশের জেলা ও সাব ডিভিশন সমূহে পুলিশ বেতার মারফত প্রেরণ করা হয়। সংবাদটি ছিল “Base for all station of East Pakistan Police, keep listening, watch, we are already attacked by the Pak Army, try to save yourself, over.”

এই সময় রাজারবাগ ওয়ারলেস রুমে উপস্থিত ছিলেন এএসআই ইয়াছিন আলী তরফদার, কনঃ মুসলিম আলী শরীফ, কনঃ মনির হোসেন, কনঃ মতিউর রহমান মতিন, কনঃ আব্দুল লতিফ, কনঃ সোহরাব হোসেনসহ আরো অনেকে। রাত ১১ টা ৩৫ মিনিটের সময় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগারের ঘন্টা পিটিয়ে সবাইকে সতর্ক ও একত্রিত করে। এরপর অস্ত্রাগারে কর্তব্যরত সেন্ট্রির রাইফেল থেকে গুলি করে অস্ত্রাগারের তালা ভাঙ্গে এবং তৎকালীন আরআই মফিজ উদ্দিনের নিকট থেকে জোর পূর্বক অস্ত্রাগারের চাবি নিয়ে নিজেদের মাঝে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিতরণ করে। প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পুলিশ সদস্যবৃন্দ পুলিশ লাইন্সের চারিদিকে,ব্যারাকের ছাদে, বিভিন্ন দালানের ছাদে এবং একটি গ্রুপ বাংলামোটরে অবস্থান নেয়।

রাত ১১টা ৪০ মিনিটের সময় পাকসেনাদের কনভয় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্রে মেইন গেটে এসে পৌছে। বাঙ্গালী পুলিশ সদস্যরাও রাজারবাগ ব্যারাকের ছাদে, বিভিন্ন বিল্ডিং-এ এবং পুলিশ লাইন্স এর বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে রাজারবাগ, চ্যামেলীবাগ, মালিবাগসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে পজেশন নেয়। রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের দক্ষিণ পূর্ব দিক (কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল কোয়ার্টার সংলগ্ন) থেকে প্রথম গুলি বর্ষণ হয়। এরপরই প্যারেড গ্রাউন্ড এর উত্তর পূর্ব দিক (শাহজাহানপুর ক্রসিং) থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়। ব্যারাকের ছাদে অবস্থানরত বাঙ্গালী পুলিশ সদস্যরা পাকসেনাদের লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ শুরু করে। শুরু হয় দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে “প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ।

ইতিহাসে সূচনা হয় একটি নতুন অধ্যায়ের। রাত ১২টার দিকে বাঙ্গালী পুলিশ সদস্যদের মরণপণ প্রতিরোধে থমকে যায় ট্যাংক ও কামান সজ্জিত পাকবাহিনী। একটু পরই মর্টার ও হেভি মেশিনগান দিয়ে গুলি বর্ষণ শুরু করে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ৪টি ব্যারাকে আগুন লাগে। পাকবাহিনী ট্যাংক বহরসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করে। এই আক্রমনে পাকবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৮শ’। রাত সাড়ে ১২টার দিকে পাকবাহিনীর ভারী অস্ত্রের মুখে বাঙ্গালী পুলিশ সদস্যরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। গেরিলা পদ্ধতিতে পাকবাহিনীর উপরে হামলা চালায় এবং এতে অনেকই হতাহত হয়। অপর একটি গ্রুপ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ মালিবাগ, চামেলীবাগ প্রান্ত দিয়ে ঢাকা শহরে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের সেদিনকার সেই অস্ত্র আর গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছে সারাদেশে, সীমান্তবর্তী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে এবং সম্মুখ যুদ্ধে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, রাত পৌনে ১২টার দিকে  শুরু হওয়া যুদ্ধ থেমে থেমে চলতে থাকে রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩ টা পর্যন্ত। বাঙ্গালী পুলিশের কিছু সূর্য সন্তান বুকে অসীম সাহস নিয়ে সমান তালে লড়ে চলে ট্যাংক, কামান আর মর্টারের বিরুদ্ধে। রাত সাড়ে ৩ টার দিকে কামান আর মর্টারের আক্রমন এক সময় থামে। বন্দী হয় প্রায় দেড়’শ বাঙ্গালী পুলিশ। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স করায়ত্ত করে দখলদারবাহিনী। তার আগেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কিছু বীর বাঙ্গালী পুলিশ অস্ত্র, গোলাবারুদসহ রাজারবাগ ত্যাগ করে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইলে।

২৫ মার্র্চ ৭১ রাতে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে পুলিশ সদস্যদের শহীদ হওয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।  ২৫ ও ২৬ শে মার্চ ‘৭১ এর রাজারবাগসহ ঢাকা শহরের সর্বত্র পাকবাহিনীর সাথে যে মরনপণ যুদ্ধ হয় সেই যুদ্ধে তৎকালীন ঢাকার রিজার্ভ ফোর্সের ৭৮ জন বীর পুলিশ সদস্য প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন। এদের অধিকাংশই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ও পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং মিলব্যারাক, রমনা থানা, পুরনো ঢাকায় বিভিন্ন এলাকায় পাক হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের হাতে শহীদ হন।

যে ভাবে প্রতিরোধ প্রস্তুতি ঃ  ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষনে দেশ ও জাতির প্রতি বঙ্গবন্ধু উদাত্ত আহবান ছাড়া বাঙালী পুলিশ সদস্যদের প্রতি বিভাগীয় চ্যানেলে আর কোন সুর্নিদিষ্ট দিক নির্দেশনা ছিল না। এমনি এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কোন সুনির্দিষ্ট রণকৌশল ছাড়াই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বীর পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগারের তালা ভেঙ্গে নিজেদের সনাতন ‘থ্রি নট থ্রী’ আর ‘মার্ক- টু’রাইফেল নিয়ে ট্যাংক, কামান, মর্টার পরিবেষ্টিত শত্রু সেনার সুপরিকল্পিত হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তা কোন নৈমিত্তিক ঘটনা নয়। এই ভাবে নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সিদ্ধান্তহীনতা, সমন্বয় হীনতার মাঝে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজেদেরকে সংঘটিত করে মারণাস্ত্র সজ্জিত একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে বুক ভরা সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যে দেশপ্রেম আর অনুপ্রেরণা দরকার তাকে ব্যক্ত করার ভাষা  নেই।  নিদারুন অনিশ্চয়তার মাঝে পুলিশ সেই দিন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন শত্রু সেনার বিরুদ্ধে তারা নিশ্চয়ই কোন স্বীকৃতি বা সম্মাননার কথা ভাবেননি।

তাদের মন্ত্র ছিল শুধুই মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচন, লড়তে জানা, মরতে আর মারতে জানা। যাদের রক্তে আজ স্বাধীন বাংলাদেশ তাদের আত্মত্যাগে অনুপ্রেরনা পেয়ে লক্ষ্য মুক্তিযোদ্ধা জনতা হাতে নিয়েছে হাতিয়ার, যে উদাহরণ কলম পেশা কেরানী, হাল বাওয়া মাঝি, লাঙল বাওয়া কৃষককে গাইতে শিখিয়েছে “তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি, শত্রু এলে অস্ত্র হাতে লড়তে জানি”, সেই সব বীর বাঙ্গালী পুলিশ সদস্যদের বড় গর্বিত উত্তরাধিকার আজকের বাংলাদেশ পুলিশ। চেতনার সেই উম্মত্ত আবেগ পেরিয়ে স্বাধীন আজ বাংলাদেশ।

আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের ২৫শে মার্চের মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনাকারী সেই বীর পুলিশ সদস্যগণ এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নের আত্মহুতি দানকারী শহীদ পুলিশ সদস্যগণের পরিবারবর্গকে ধারাবাহিক সম্মাননা প্রদান করছেন। জাতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পুলিশের এই সামান্য স্বীকৃতি ও সম্মাননা আমাদের সেই দিনের সেই বীর পূর্বসূরীদেরকে আর তাদের উত্তরসূরীদেরকে দিয়ে যাচ্ছে আনন্দাশ্রু বিসর্জনের বিরল সুযোগ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এখনো পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে বড় গর্ব। মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সূচনা বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকা অবিসংবাদিত। বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র প্রতিরোধের শুধু সূচনাই করেনি বরং ২৫শে মার্চে বাজারবাগ পুলিশ লাইনস  শুরু হওয়া পাক আর্মি আর বাংলাদেশ পুলিশের যুদ্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে ৬৮ হাজার গ্রামের সবুজ শ্যামলিমায়।

মহান মুক্তি যুদ্ধের সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনাকারী বাংলাদেশ পুলিশের এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ জাতির জনকের কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সনের স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেন বাংলাদেশ পুলিশকে।

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের এই আত্মত্যাগ ও গৌরবের ইতিহাস তুলে ধরে রাখার জন্য ২০১৩ সালে ২৪ মার্চ যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ঐতিহাসিক রাজারবাগ পুলিশ লাইনস প্রাঙ্গণে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালিন পুলিশের গৌরবময় স্মৃতিচিহ্ন ও স্মারক সম্ভার সাজানো রয়েছে। আর জাদুঘরে প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধের সেই পাগলা ঘন্টা। যে পাগলা ঘন্টা বাজিয়ে  পুলিশ সদস্যদের একত্রিত করে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। আরও রয়েছে প্রতিরোধ যুদ্ধে ব্যবহৃত হ্যান্ড মাইক, বেতের তৈরী ঢাল, সেই পুরনো রাইফেলসহ প্রতিরোধ যুদ্ধের নানা ইতিহাস। ৭১ সালের সেই ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে  রক্তস্নাত  রাজারবাগে সূচিত হয় প্রথম প্রতিরোধ। ভয়াল সেই রাতে পাকহানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর ইতিহাসের যে জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল সেই পৈশাচিকতার প্রথম টার্গেট ছিল রাজারবাগের পুলিশ। আকস্মিক আক্রমণে হতাশ না হয়ে দ্রুততম সময়ে সুসংগঠিত হয়ে আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত শক্তিশালী পাক সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ৩০৩ রাইফেল নিয়ে পুলিশ সদস্যরা যে প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন ইতিহাসে তা এক বিরল দৃষ্টান্ত।

২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে গণহত্যার জন্য প্রণীত বিভীষিকাময় ‘অপারেশন সার্চ লাইটের’ অন্যতম টার্গেট করা হয় পুলিশকে, আর পুলিশ বিভাগের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সকে। গ্রহণ করা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের পুলিশ সদস্যদেরকে নিরস্ত্রী করণের ঘৃণ্য পরিকল্পনা।

 

Read 1569 times