জানা-অজানাঃ পুলিশ - -শান্তিরঞ্জন ভৌমিক

 

 

 

 

 

 

 


     প্রতি বছর পহেলা মার্চ পুলিশ মেমোরিয়াল ডে উদ্যাপন করা হবে, যা বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্যের আত্মত্যাগ ও কর্তব্যনিষ্ঠার এক অনন্য স্বীকৃতি। প্রথমবারের মতো পালিত এ দিবসের প্রেক্ষিতে পুলিশ সম্পর্কে মনের অব্যক্ত অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ পাওয়ায় অত্যন্ত আনন্দিত।
    পুলিশি কার্যক্রম এ উপমহাদেশে কখন শুরু হয়েছে জানি না। তবে রাজা শাসিত দেশে শৃঙ্খলা বিধানের জন্য বা নিজেদের আধিপত্য রক্ষা করার জন্য দেশরক্ষা বাহিনীর আদলে অভ্যন্তরীন বাহিনীর প্রয়োজনীয়তার তাগিদে যে নামেই হোক রাজার সহায়ক বাহিনী অবশ্যই ছিল। এ বাহিনী কতটা জনবান্ধব ছিল তা আমার জানা নেই। বৃটিশ যখন এ দেশে আসে, তারাই নিজস্ব বাহিনী হিসেবে পুলিশ নামধারী বিভাগ সৃষ্টি করে নেয়। যদিও পুলিশ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো শান্তিরক্ষা বিভাগের কর্মচারী, অপরাধীকে ধরা বা অপরাধ নিবারণের জন্য নিয়োজিত সরকারি বিভাগ, কোতোয়াল। অন্যদিকে কোতোয়াল শব্দের অর্থ হলো- নগর রক্ষক, প্রহরী, থানাদার, কোটাল। তবে ‘কোটাল’ শুধুমাত্র নগর রক্ষক। ফলে, ব্রিটিশ শাসনামলে পুলিশ যতটা না জনবান্ধব, তার চেয়ে শাসক বন্ধব হিসেবে ছিল নিবেদিত। তখন পুলিশকে সিপাহীও বলা হতো এবং সিপাহীরা ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে একবার ব্যাপক বিদ্রোহ ঘোষনা করেছিল এবং ব্রিটিশ সরকার তখন পুলিশ বিভাগের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন করে, এ আইনের প্রভাব বা বিধান এখনো বিদ্যমান। বৃটিশ শাসনের পর দেশ বিভাগ হয় এবং একই আদলে পুলিশি কার্যক্রম চলতে থাকে। যদিও আমার জন্ম বৃটিশ শাসনের প্রায় শেষ লগ্নে, তা প্রত্যক্ষ করার মত বয়স আমার ছিল না। দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান আমলের পুলিশি কার্যক্রম দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়েছিল। বিশেষত আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী।
    বাল্যকালে গ্রামে বসবাস করার ফলে পুলিশ নামটির সঙ্গে পরিচিত থাকলেও ব্যক্তিরা ছিলেন অনেক দূরে। গ্রামে কখনো পুলিশের পদধূলি পড়ত না, কেবল নির্বাচনকালীন ভোট কেন্দ্রে ২/৩ জন পুলিশ কতিপয় আনসার এবং গ্রামরক্ষা বাহিনী হিসেবে চৌকিদার, দফাদার - তাদেরই চিনতাম, দেখতাম এবং প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্কের মধ্যে আবর্তিত হতাম। সত্যি বলতে কি, তখন পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক অনেক কথাই শুনতাম, বিশ^াস-অবিশ^াস বিষয়টি ছিল মিশ্র। তবে ভীতিকর মানসিকতায় ভিন্ন গ্রহের অসামাজিক নিষ্ঠুরতার প্রতিনিধি হিসেবেই বিবেচনা করেই এসেছিলাম। ১৯৬৪ সালে ঢাকা-নারায়নগঞ্জ দাঙ্গার পর আমাদের পরিবার অন্যান্যদের মতো দেশত্যাগী হতে চেয়েছিল। এ জন্য আমার এক কাকার সাথে আগরতলা গিয়েছিলাম। সেখানে একজন পুলিশের গলায় তুলসীর মালা দেখতে পেয়ে অবাক হয়েছিলাম। পুলিশের গলায় তুলসীর মালা ধর্মীয় বিবেচনায় এটা যেন বেমানান, পূর্ব ধারনার জন্যই আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল। তারপর বিশ^বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রে তথা কলেজ শিক্ষকতা করতে গিয়ে নানাভাবে পুলিশ বা পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা হয়েছে, পরিচিত ২/৩ জন বন্ধু তখন পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা, ছাত্ররাও এ বিভাগে যোগদান করেছে এবং তখন থেকে পূর্বের কল্পিত ও শ্রুত ধারনার ব্যাপক পরিবর্তন হতে থাকে।
    ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আমি কুমিল্লা শহরে ছিলাম। এ ভয়াল কালো রাতে ময়নামতি সেনানিবাস থেকে পাক হানাদার বাহিনী কুমিল্লা শহরমুখী হতে গিয়ে প্রথম প্রবলভাবে বাধাগ্রস্থ হয় কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সের পুলিশ বাহিনী দ্বারা। আমরা চিন্তাও করতে পারিনি- বাঙ্গালি পুলিশ বাহিনী কতটা মানসিক শক্তি নিয়ে একটি দুর্ধর্ষ পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আমরা রাতভর গোলাগুলির আওয়াজ শুনেছি, বুঝতে পারিনি কাদের সঙ্গে এ গোলাগুলি বিনিময় হচ্ছে, সকালে আস্তে আস্তে খবর শুনতে পাই। কুমিল্লার পুলিশ লাইনে সে রাতে বহু পুলিশ ভাই শহীদ হয়েছেন, বহু আহত হয়েছেন। কুমিল্লার এ পুলিশ যার দ্বারা অনুপ্রাণিত ও নির্দেশিত হয়েছিলাম, তিনি তখনকার জেলা পুলিশ প্রধান মুন্সী কবির উদ্দিন। এজন্য স্বল্পসময়ের মধ্যেই এ কাজের জন্য তাঁকে প্রাণ দিতে হয়। সে সময় শুনতে পাই, ঢাকা রাজারবাগ পুলিশ লাইনেও পাক হানাদার বাহিনী আক্রমন করে বহু পুলিশ ভাইকে হত্যা করে। কেন? পাক হানাদার বাহিনী পুলিশ বাহিনীর প্রতি এতটা ক্ষুব্ধ ছিল কেন? তারা কি জনতো যে পূর্ব পাকিস্তানের তখনকার পুলিশ বাহিনী স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থক ও সহায়ক শক্তি ? এ দেশের পুলিশ বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন বাঙ্গালি- এটাই কি অন্যতম কারন? নানাভাবেই যুক্তি বা কারন খোঁজা যেতে পারে। এতদিন শুনে এসেছি পাক-শাসকদের হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার ধারাবাহিকতায় প্রথমে সংখ্যালঘু, তারপর আওয়ামীপন্থি রাজনীতিক এবং পাশাপাশি নারী নির্যাতন এবং এক সময় বাঙ্গালি নিধন - এ অভিযাত্রায় হায়েনারা কার্যক্রম শুরু করেছিল। কিন্তু ইতিহাস এখন কি বলে। পাক হানাদার বাহিনী কেন মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে পুলিশ বাহিনীকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয় ? প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধটি তো এক পক্ষে পাক হানাদার বাহিনী অন্য পক্ষটি আমাদের পুলিশ বাহিনী। এটা তো ইতিহাসের কথা, সত্য ঘটনার উজ্জ্বল ত্যাগের কথা। আমার কি আমাদের গৌরবোজ্জ্বল দিকটি নিয়ে ভেবেছি? বরং এ বাহিনীকে নিয়ে আমাদের নেতিবাচক ধারনার শেষ নেই। পুলিশ যে আমাদের সন্তান-ভাই এবং সমাজের অংশ তা যেন ভুলে গেছি। দিনরাত যারা জননিরাপত্তার জন্য জনগণের পাহারায় নিয়োজিত, রাতের ঘুম হারাম করে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দুপুর রাতের খাবারটি মুখে তুলে কর্তব্যকর্মটি করে যায়- একবারও আমরা দরদ দিয়ে তাদের কুশল বিনিময় করেছি? তারা একটু ভালভাবে বাঁচতে চাইলে আমার শত প্রশ্নের ডালি তাদের সম্মুখে তুলে ধরি। ভুলে যাই - তাঁরাও একটি সরকারি চাকুরি করেন, তাদের চাকুরির বিধিবিধান আছে, কর্মধারার সুযোগ-সুবিধা তাঁদের চাকুরির শর্তেই বিধিবদ্ধ। দেশ-কালের ব্যবধানে অনেক কিছু পাল্টায়, কিন্তু পুলিশ সম্পর্কে আমাদের ধারণা যেন একই থেকে যাচ্ছে। এখানেই সমস্যাটা নিহিত। আজ বিশেষত বাংলাদেশের পুলিশ অবশ্যই জনবান্ধব। সরকার আসে, সরকার পরিবর্তন হয়, তাতে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়, বিবেক প্রসূত চৈতন্যের তেমন পরিবর্তন এখন ঘটে না। একসময় পুলিশ পরিচালিত হতো কর্তার ইচ্ছায়, এখন হয় বিবেক-বুদ্ধি ও  আত্মমর্যাদায়। পুলিশ বাহিনী আপন আদর্শে বিকশিত হওয়ার মতো শক্তি অর্জন করেছে বাংলাদেশে যার ফলশ্রুতিতে উচ্চ শিক্ষিত আত্মপ্রত্যয়ীরা এ চাকুরিকে দেশসেবার মানসিকতায় গ্রহণ করেছেন।
    কুমিল্লা জেলা বাংলাদেশের এক সমৃদ্ধ জনপদ। এখানকার অধিবাসীদের ইতিহাস ঐহিত্য প্রাচীনকাল থেকেই উজ্জ্বলতর স্বীকৃতি লাভ করে আসছে। এ মাটিতে যাঁরা বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করতে এসেছেন, তাঁরা কুমিল্লার প্রেমে মুগ্ধ থেকেছেন। এ জেলাকে এতটা আপন করে নিয়েছিলেন বা নিচ্ছেন- ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের উষালগ্নে যে সকল পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছেন তাঁরা অনেকেই কুমিল্লার সন্তান ছিলেন না, শহীদ পুলিশ সুপারও ছিলেন না। এ আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় অন্তত কুমিল্লায় পুলিশ বাহিনী কুমিল্লার ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও বাহক। এটা মুখের কথা নয়- বর্তমান কুমিল্লার পুলিশ প্রশাসনের প্রধান ব্যক্তি তথা পুলিশ সুপার মহোদয় যখন বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল অর্জন করেন এবং কুমিল্লা জেলা অস্ত্র, মাদক উদ্ধারসহ অপরাধ দমনে সারাদেশে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পায় তখন কুমিল্লাবাসী হিসেবে আমরা গর্বে আপ্লুত হই।
    তাই আজ পুলিশ মেমোরিয়াল দিবসে শ্রদ্ধাভরে পুলিশ বাহিনীর শহীদদের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানাই, যারা এ বাহিনীকে উজ্জ্বল ও বিকশিত করেছেন তাঁদের অভিনন্দন জ্ঞাপন করি। বর্তমান কুমিল্লার পুলিশ প্রশাসনকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও তাঁদের সাফল্যকে মোবারকবাদ জানাই।

 

 

 

 

 

 

 

Read 1444 times